রিভার্স নিউজ ডেস্ক: জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে ভাষণ দিয়েছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। নিউইয়র্কের বিশ্বমঞ্চে তিনি রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু ন্যায়বিচার, ফিলিস্তিন, শান্তিরক্ষা এবং দেশের গণতান্ত্রিক পুনর্গঠনের মূল কথাগুলো তুলে ধরেন। পূর্ণাঙ্গ ভাষণ দীর্ঘ। পাঠকের জন্য এখানে সেই ভাষণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলো তুলে ধরা হলো।

অধিবেশনের প্রতিপাদ্য ছিল—“Restoring Trust, Managing Transformation: A United Nations that Delivers for All”। প্রধানমন্ত্রী একে সময়োপযোগী বলে বর্ণনা করেন এবং বলেন, আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তায় বাংলাদেশ বহুপাক্ষিকতায় বিশ্বাসী।

সভাপতিকে অভিনন্দন

ভাষণের শুরুতে তিনি ৮১তম অধিবেশনের নির্বাচিত সভাপতিকে অভিনন্দন জানান এবং দায়িত্ব পালনে বাংলাদেশের পূর্ণ সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেন। বিদায়ী সভাপতি আনালেনা বেয়ারবককে তাঁর নেতৃত্বের জন্য ধন্যবাদ জানান।

গণতান্ত্রিক রূপান্তর

প্রধানমন্ত্রী শহীদ বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও মানবাধিকারের সংগ্রামে আত্মত্যাগকারীদের স্মরণ করেন। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি বলেন, দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি আন্দোলন ও হাজারো প্রাণের বিনিময়ে বাংলাদেশ ফ্যাসিবাদমুক্ত হয়েছে।

চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জনগণের রায়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকার গঠন করেছে—এ কথা উল্লেখ করে তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন, «জনগণই আমাদের সকল রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস।»

পিতা-মাতার স্মৃতি

একই মঞ্চে তিনি স্মরণ করেন স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে। তাঁরাও এই মঞ্চে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁদের পথ ধরেই তিনি দেশ ও একটি শান্তিপূর্ণ বিশ্বের কথা বলতে এসেছেন বলে জানান।

সংঘাতের সমাধান কূটনীতিতে

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিশ্বের যেকোনো প্রান্তের যুদ্ধ এখন প্রতিটি দেশকেই ছুঁয়ে যায়। মানবিক সংকট, বাস্তুচ্যুতি, জ্বালানি ও সরবরাহে চাপ এবং মূল্যস্ফীতি—সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়ছে। সমাধান একমাত্র আলোচনা, কূটনীতি ও সহযোগিতায়।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ এমন এক বিশ্ব চায় যেখানে অস্ত্র নয়—যুক্তি, শিক্ষা ও মানবতাই পরিবর্তনের হাতিয়ার। পূর্ণাঙ্গ নিরস্ত্রীকরণ, পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ এবং অস্ত্র নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সামরিক বাজেটের বাড়াবাড়ি বিশ্বশান্তির অন্তরায় বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

ফিলিস্তিন

স্বাধীনতাকামী ফিলিস্তিনিদের দুর্দশার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের দাবিতে বাংলাদেশের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন।

হেফাজত থেকে পলাতক আসামি সুলতান, দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ

শান্তিরক্ষা মিশন

জাতিসংঘ শান্তি গঠন কমিশনের ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে বাংলাদেশ টেকসই শান্তি ও সংঘাত প্রতিরোধে কাজ করছে বলে তিনি জানান। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও বাংলাদেশি শান্তিরক্ষী, বিশেষ করে নারী শান্তিরক্ষীদের সাহসিকতার কথা তিনি গর্বের সঙ্গে উল্লেখ করেন।

রোহিঙ্গা: সমাধান মিয়ানমারে

দীর্ঘ ৯ বছরের বেশি সময় ধরে মিয়ানমার থেকে বাস্তুচ্যুত ১২ লক্ষাধিক রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেওয়ার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এতে বাংলাদেশের অর্থনীতি, পরিবেশ, নিরাপত্তা ও স্থানীয় সমাজের ওপর প্রচণ্ড চাপ পড়েছে।

তিনি স্পষ্ট করেন, সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে, স্থায়ী সমাধানও মিয়ানমারে। নিজ মাতৃভূমিতে মর্যাদাপূর্ণ ও নিরাপদ প্রত্যাবাসনই একমাত্র পথ। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ও জাতিসংঘকে প্রত্যাবাসনে কার্যকর ভূমিকা রাখতে এবং ততদিন জীবনরক্ষাকারী সহায়তা বজায় রাখতে তিনি আহ্বান জানান।

জলবায়ু ন্যায়বিচার

বৈশ্বিক কার্বনে বাংলাদেশের অবদান নগণ্য, অথচ দেশটি জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম ভুক্তভোগী। এই বৈষম্য দূর করতে কপ৩১-এ জলবায়ু ন্যায়বিচার ও অভিযোজন তহবিলে কঠোর পদক্ষেপের দাবি জানান তিনি।

দেশের দিক থেকে তিনি তিনটি বড় উদ্যোগের কথা বলেন: আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ, বন্যা-খরা মোকাবিলায় ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খনন, এবং সুন্দরবনে স্বাদুপানির প্রবাহ, তিস্তা মহাপরিকল্পনা ও পদ্মা ব্যারেজের কাজ এগিয়ে নেওয়া। আন্তঃসীমান্ত নদীর জন্য ১৯৯২ সালের ওয়াটার কনভেনশনে স্বাক্ষরের কথাও তিনি উল্লেখ করেন।

পুনর্গঠন, তরুণ ও নারী

দীর্ঘ শাসনের পর গুম, হত্যা, দুর্নীতি ও অর্থ পাচারের ক্ষত থেকে বেরিয়ে দেশকে দাঁড় করাতে সরকার তিন ধাপের কৌশল নিয়েছে—পুনরুদ্ধার, পুনঃপ্রতিষ্ঠা ও পুনর্গঠন। তরুণদের স্টার্টআপের জন্য চলতি অর্থবছরে ৫ কোটি ডলার বরাদ্দের কথা বলেন তিনি। বাংলাদেশকে বৈশ্বিক উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে গড়ার কথাও আসে।

জনসংখ্যার অর্ধেক নারী। স্নাতক পর্যন্ত নারীদের অবৈতনিক শিক্ষা এবং ক্ষুদ্র-মাঝারি শিল্পে নারী উদ্যোক্তাদের সহজ ঋণের কথা তিনি বলেন। পরিবারের নারী প্রধানের নামে ফ্যামিলি কার্ড, তার সঙ্গে কৃষক, ক্রীড়া ও ই-হেলথ কার্ড—পরে এগুলো একটি ইউনিভার্সাল কার্ডে আনার পরিকল্পনাও উল্লেখ করেন। নির্বাচনের আগের ৩১ দফার সঙ্গে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যের মিল রয়েছে বলে তিনি জানান।

অর্থনৈতিক ধাক্কায় দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে বাংলাদেশের ৬.২ কোটি মানুষ

এআই বিভাজন ও এলডিসি উত্তরণ

প্রধানমন্ত্রী সতর্ক করেন, «আজকের ডিজিটাল বিভাজন যেন আগামী দিনের এআই বিভাজনে রূপ না নেয়।» উন্নয়নশীল দেশের জন্য সহজ শর্তে প্রযুক্তি, দক্ষতা ও গবেষণার সুযোগ এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও সামাজিক মাধ্যমের অপব্যবহার রোধে জাতিসংঘের স্পষ্ট নীতিমালা—এই দাবি তিনি রাখেন।

স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে টেকসই উত্তরণে বাজার সুবিধা, দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন ও প্রযুক্তি সহায়তা লাগবে বলে তিনি জানান। আঞ্চলিক সংযোগ ও বাণিজ্যে পারস্পরিক সমৃদ্ধির ওপরও গুরুত্ব দেন।

সবার আগে বাংলাদেশ

ভাষণের শেষে তিনি এমন এক বাংলাদেশের ছবি আঁকেন, যেখানে দল, মত, ধর্ম বা বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি নাগরিক সমান অধিকার নিয়ে নিরাপদে থাকবে। সরকারের মূল বার্তা তিনি ঘোষণা করেন—«সবার আগে বাংলাদেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ।»

বিশ্বশান্তি ও জাতিসংঘের মূলনীতির প্রতি সমর্থন জানিয়ে তিনি ভাষণ শেষ করেন—«আল্লাহ হাফেজ, বাংলাদেশ জিন্দাবাদ।»

রিভার্স নিউজ ডেস্ক · নিউইয়র্ক · ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, সকাল ১১টা ১৮ মিনিট