রিভার্স নিউজ ডেস্ক: সাম্প্রতিক দুটি ভিন্ন ঘটনা বাংলাদেশের আইনি ব্যবস্থা ও আইনের শাসন নিয়ে জনমনে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একদিকে একটি পশুর হাটের ইজারা নিয়ে সংঘর্ষের মামলায় জামায়াতে ইসলামীর ২৫ জন নেতাকর্মীর জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। অন্যদিকে, একটি গুরুতর ধর্ষণ মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত সাবেক এক বিএনপি নেতা আপিলে জামিন পেয়ে ফুলের মালায় সিক্ত হয়েছেন এবং প্রকাশ্যে মামলার বাদীকে হুমকি দিয়েছেন। আইনের চোখে সবাই সমান—এই নীতির বাস্তব প্রয়োগ কতটা হচ্ছে এবং আইনকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, এই প্রতিবেদন সেই বিষয়গুলোর আইনি ব্যাখ্যা ও বিশিষ্টজনদের মতামতের ওপর ভিত্তি করে তৈরি।

ঘটনা দুটির আইনি বিশ্লেষণ

প্রথম ঘটনাটিতে, নেত্রকোনার পূর্বধলায় পশুর হাট নিয়ে রাজনৈতিক ও দলীয় কোন্দলের জেরে ভাঙচুরের মামলায় জামায়াত নেতাকর্মীরা নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণ করলে বিচারক তাদের জামিন নামঞ্জুর করেন। সাধারণত এ ধরনের সংঘর্ষ, বেআইনি সমাবেশ বা দাঙ্গার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ১৪৩ (বেআইনি সমাবেশ) এবং ১৪৭ (দাঙ্গা) ধারায় মামলা পরিচালিত হয়, যেখানে দোষী সাব্যস্ত হলে কারাদণ্ড বা জরিমানার বিধান রয়েছে।

দ্বিতীয় ঘটনাটিতে, যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত বিএনপি নেতা ফৌজদারি কার্যবিধির ৪২৬ ধারা অনুযায়ী আপিল বিচারাধীন থাকা অবস্থায় উচ্চ আদালত থেকে জামিন পেয়েছেন। আইন অনুযায়ী আপিল চলাকালে আদালত যুক্তিসংগত কারণে আসামির সাজা স্থগিত রেখে জামিন মঞ্জুর করতে পারেন। তবে, জামিনে বের হয়ে তিনি প্রকাশ্যে বাদী বা প্রতিপক্ষকে যে হুমকি দিয়েছেন, তা বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৫০৬ ধারার (অপরাধমূলক ভীতি প্রদর্শন) আওতাভুক্ত একটি সুস্পষ্ট ও পৃথক অপরাধ। এই ধারায় মৃত্যু বা গুরুতর আঘাতের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হলে অপরাধীর সর্বোচ্চ সাত বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে।

হেফাজত থেকে পলাতক আসামি সুলতান, দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ

আইনের শাসন ও বিশিষ্টজনদের মত

আইনের শাসন বলতে স্পষ্টভাবে বোঝানো হয় যে, আইনের চোখে সকলে সমান এবং কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নন। কিন্তু একই সময়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির দুটি মামলায় আইনের এমন দৃশ্যত সাংঘর্ষিক ফলাফল বিচার ব্যবস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ শাহদীন মালিক এ বিষয়ে একটি স্পষ্ট মতাদর্শ ধারণ করেন। তাঁর মতে, দেশে আইনের শাসন না থাকার জন্য আইন দায়ী নয়, বরং যারা আইন প্রয়োগ করেন তাদের অপপ্রয়োগই মূলত দায়ী। তিনি মনে করেন, বিগত বছরগুলোর জবাবদিহিতাহীনতা বা স্বেচ্ছাচারিতা সংবিধান বা আইনের নিজস্ব কোনো দোষ নয়, বরং এটি তাদেরই দোষ যারা নিজেদের স্বার্থে আইনকে বারবার অপব্যবহার করেছেন। আইনের শাসন তখনই প্রতিষ্ঠিত হয় যখন যেকোনো আইনি সিদ্ধান্তে বা পরিবর্তনে জনগণের স্বার্থ ও অধিকারের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয় এবং আইনকে দল বা ব্যক্তির প্রভাবমুক্ত রাখা হয়।

আইন প্রণয়ন করা হয় নাগরিকের অধিকার ও স্বাধীনতা রক্ষার জন্য। কিন্তু যখন রাজনৈতিক প্রভাব বা দলীয় কোন্দলের কারণে সাধারণ সংঘর্ষের মামলায় জামিন বাতিল হয়, অথচ যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামি জামিন পেয়ে জনসমক্ষে হুমকি দেওয়ার পরও দণ্ডবিধির ৫০৬ ধারায় তার বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয় না, তখন আইনের সুষম প্রয়োগ বাধাগ্রস্ত হয়। আইনের শাসনকে অর্থবহ করতে হলে বিচারিক প্রক্রিয়াকে দলীয়করণের ঊর্ধ্বে রাখতে হবে। রাজনৈতিক বা সামাজিক পরিচয় নির্বিশেষে দেশের প্রতিটি নাগরিকের জন্য আইনের সমান প্রয়োগ নিশ্চিত করাই একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের প্রধান শর্ত।

নেত্রকোনায় নিখোঁজের ছয় দিন

রিভার্স নিউজ ডেস্ক · ১ অক্টোবর ২০২৬, রাত ২টা ৩২ মিনিট ০০ সেকেন্ড