রিভার্স নিউজ ডেস্ক: গত ২৪ সেপ্টেম্বর রাত থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্টার ঘুরছে। শিরোনাম—«কোন যোগ্যতায় জাতিসংঘে খলিলুর রহমানের অফিসে চাকরি পেলেন জাইমা?» ছবিটি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী পেজের আইডি Md Zisan Ahmad-এর পোস্ট থেকে ছড়িয়েছে। লাইক-শেয়ার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দাবিটা একটা «প্রতিষ্ঠিত সত্য» হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু পোস্টারের প্রতিটি লাইন সত্য নয়। কিছু সত্য, কিছু আংশিক সত্য, কিছু অতিরঞ্জিত, একটি দাবির কোনো প্রমাণই নেই।

রিভার্স নিউজ জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতির অফিসিয়াল ওয়েবসাইট, বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের প্রকাশিত ফল, সংশ্লিষ্ট ল ফার্মের পাবলিক তথ্য এবং একাধিক জাতীয় দৈনিকের প্রতিবেদন মিলিয়ে দাবিগুলো যাচাই করেছে।

যা সত্য

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও ডা. জুবাইদা রহমানের মেয়ে জাইমা জারনাজ রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি, পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের কার্যালয়ে লিগাল অফিসার হিসেবে তালিকাভুক্ত। অফিসে প্রায় ৪০ জনের মধ্যে ছয়জন বাংলাদেশি। এই নিয়োগ অস্বীকার করার সুযোগ নেই।

পোস্টারের তিনটি দাবি এখানে সত্য। এক, বাংলাদেশে তিনি এখনো অ্যাডভোকেট হিসেবে এনরোলড নন—২০২৬ সালের জুনে বার কাউন্সিলের শুধু প্রথম ধাপ এমসিকিউ পাস করেছেন, লিখিত ও ভাইভা বাকি। দুই, সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদ অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটসের পাবলিক ওয়েবসাইটের টিম তালিকায় তাঁর নাম নেই। তিন, ওই ফার্মের সাবেক লিটিগেশন পার্টনার মো. আসাদুজ্জামান এখন আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী; ফার্ম তাঁকে স্যাব্যাটিক্যালে দেখিয়েছে। সংযোগটি সত্য।

যা আংশিক সত্য

জাইমা রহমান ২০১৯ সালের দিকে যুক্তরাজ্যে বার-অ্যাট-ল সম্পন্ন করে কলড ব্যারিস্টার। «ব্যারিস্টার» উপাধি মিথ্যা নয়। তবে ইংল্যান্ড-ওয়েলসের প্র্যাকটিসিং রেজিস্টারে থাকতে হয় পিউপিলেজ ও প্র্যাকটিসিং সার্টিফিকেট। সেই সার্টিফিকেটের পাবলিক প্রমাণ মেলেনি। বাংলাদেশে অনেকেই পিউপিলেজ ছাড়াই ব্যারিস্টার লেখেন—এটা প্রচলিত, কিন্তু পূর্ণ প্র্যাকটিসিং ইংলিশ ব্যারিস্টারের সমান নয়।

«২০২২-এর পর কোনো ল ফার্মে কাজ করেননি»—এই লাইনও আংশিক। ২০২০ থেকে ২০২২ সালে লন্ডনের কয়েকটি ফার্ম ও লিগাল অ্যাডভাইস সেন্টারে কাজের রেকর্ড আছে। তার পর পূর্ণকালীন চেম্বার প্র্যাকটিসের শক্ত প্রমাণ দুর্বল। জাতিসংঘের অফিসিয়াল বায়োতে সৈয়দ ইশতিয়াক আহমেদ অ্যান্ড অ্যাসোসিয়েটসে কাজের উল্লেখ আছে; ফার্মের সাইটে নাম না থাকা মানেই কাজ হয়নি—এমন সিদ্ধান্তও টানা যায় না। জুনিয়র বা স্বল্পমেয়াদি কাজ প্রায়ই ওয়েবসাইটে ওঠে না।

আগের সভাপতির লিগাল উপদেষ্টাদের আন্তর্জাতিক আইনে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ছিল, অন্য সিনিয়রদের দশ বছরের বেশি কাজ আছে—তুলনাটা যুক্তিসংগত। জাইমার বয়স প্রায় ৩০, কল ২০১৯। পদটি অফিসের অন্য সিনিয়র উপদেষ্টাদের তুলনায় জুনিয়র। কিন্তু এতে নিয়োগ «অবৈধ» প্রমাণ হয় না। সভাপতি নিজেই এক বছরের নিজস্ব দপ্তরের কর্মী বাছাই করেন।

যা অতিরঞ্জিত ও অপ্রমাণিত

«আগের কোনো প্রেসিডেন্টের লিগাল অফিসার পাওয়া যায় নি»—এই বাক্য অতিরঞ্জিত। প্রতিটি সভাপতির অফিসে লিগাল সহায়তা থাকে। পদের নাম বদলায়—লিগাল অফিসার, লিগাল অ্যাডভাইজার বা স্পেশাল অ্যাডভাইজার। পদই ছিল না বলা ভুল।

পিউপিলেজ সম্পন্নের সরকারি পাবলিক রেকর্ড পাওয়া যায়নি—এটাকে «যাচাই হয়নি» বলা যায়, «কখনো করেননি» বলে কাটা যায় না। আর «এ বছরের শুরুতে লিগাল সেক্রেটারির পার্ট-টাইম চাকরি খুঁজছিলেন»—এই দাবির কোনো নির্ভরযোগ্য সংবাদ, বিজ্ঞাপন বা অফিসিয়াল সূত্র নেই। প্রমাণহীন দাবিকে নিশ্চিত সত্যের মতো পোস্টারে বসানোই বিভ্রান্তি।

দাবি ও রায় এক নজরে

জাতিসংঘে লিগাল অফিসার নিয়োগ পেয়েছেন — সত্য।

নিজেকে ব্যারিস্টার দাবি — আংশিক সত্য।

ব্যারিস্টারস রেজিস্টারে নাম নেই — আংশিক সত্য।

এখনো পিউপিলেজ করার প্রমাণ নেই — অপ্রমাণিত।

২০২২-এর পর কোনো ল ফার্মে কাজ করেননি — আংশিক সত্য।

লিগাল সেক্রেটারির পার্ট-টাইম চাকরি খুঁজছিলেন — অপ্রমাণিত, পোস্টারে নিশ্চিত সত্যের মতো বসানো মিথ্যাচার।

হেফাজত থেকে পলাতক আসামি সুলতান, দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ

বাংলাদেশে এখনো আইনি লাইসেন্স নেই — সত্য।

ল ফার্মের ওয়েবসাইটে নাম নেই — সত্য।

ল ফার্মের পার্টনার এখন আইনমন্ত্রী — সত্য।

আগের সভাপতির লিগাল অফিসার পদই ছিল না — অতিরঞ্জিত।

অন্যদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, তাঁর তুলনায় কম — আংশিক সত্য।

সারকথা: নিয়োগ সত্য। পুরো পোস্টার «কোনো যোগ্যতা নেই» ফ্রেমে বাঁধা—এটাই বিভ্রান্তিকর।

যাচাই ছাড়া পোস্টার কেন অপরাধের ঘরে পড়তে পারে

সমালোচনা সংবিধানসম্মত। প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তোলাও গণতন্ত্রের অংশ। কিন্তু প্রশ্ন আর মিথ্যা দাবি এক জিনিস নয়। যে পোস্টার যাচাই করে না, অপ্রমাণিত কথা «সত্য» করে লেখে, মুখের ছবি লাগিয়ে যোগ্যতাকে শূন্য বলে চালায়—সেটা মতপ্রকাশ নয়, বিভ্রান্তি।

এ ধরনের কনটেন্ট তিনটি ক্ষতি করে। প্রথম, ব্যক্তির সামাজিক সম্মান ক্ষুণ্ন হয়। দ্বিতীয়, পাঠক ভুয়া তথ্যকে খবর ভেবে শেয়ার করে। তৃতীয়, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আঘাত করার জন্য «ফ্যাক্ট চেক»-এর মুখোশ পরে আসলে প্রচার চালায়। যে সংগঠন বা পেজ নিজে যাচাই করে না, অথচ অন্যের যোগ্যতা নিয়ে চূড়ান্ত রায় দেয়—তারাই আজকের গুজবের কারখানা।

আইন কী বলে, শাস্তি কী

বাংলাদেশে মিথ্যা, মানহানিকর বা গুজবমূলক পোস্টের বিরুদ্ধে একাধিক আইন কাজ করে। ফৌজদারি ও দেওয়ানি দুই দিকই খোলা।

দণ্ডবিধি, ১৮৬০। ধারা ৪৯৯-এ মানহানির সংজ্ঞা আছে। কোনো ব্যক্তি বা তাঁর পরিবার সম্পর্কে এমন কথা প্রকাশ করা, যাতে সমাজে তাঁর সুনাম কমে, সেটা মানহানি হতে পারে। ধারা ৫০০ অনুযায়ী দোষী সাব্যস্ত হলে সর্বোচ্চ দুই বছর সশ্রম বা বিনাশ্রম কারাদণ্ড, বা অর্থদণ্ড, বা উভয় দণ্ড হতে পারে। পোস্টার, স্ট্যাটাস, শেয়ার—সবই «প্রকাশ»।

ধারা ৫০৫ জনশৃঙ্খলা নষ্ট করতে পারে এমন বিবৃতি ছড়ানোর কথা বলে। রাজনৈতিক উত্তেজনার সময় ভিত্তিহীন অভিযোগ ছড়ালে এই ধারার প্রশ্ন ওঠে।

অনলাইন পোস্ট শুধু দণ্ডবিধিতেই থামে না। ২০২৩ সালের সাইবার নিরাপত্তা আইন পরে বদলে ২০২৫ সালের অধ্যাদেশ এবং ২০২৬ সালের ১০ এপ্রিল সাইবার সুরক্ষা সংক্রান্ত আইন হিসেবে গৃহীত হয়; ৩০ জুন সংশোধন হয়। অনলাইনে মানহানি, ভুয়া তথ্য ও ক্ষতিকর কনটেন্টের ধারা এই কাঠামোতেই আছে। জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ সরকার আরও সংশোধনীর খসড়া এনেছে—যেখানে গুজব-অপতথ্যে সর্বোচ্চ দশ বছর কারাদণ্ড বা ৪০ লাখ টাকা জরিমানা এবং মানহানিতে সর্বোচ্চ পাঁচ বছর বা ২০ লাখ টাকার প্রস্তাব আছে। খসড়াটি এখনো পাশ হয়নি। পাশ হলে শাস্তি আরও কঠোর হবে। আপাতত দণ্ডবিধির মানহানি ধারা এবং বলবৎ সাইবার আইনের ধারাই প্রযোজ্য।

অর্থনৈতিক ধাক্কায় দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে বাংলাদেশের ৬.২ কোটি মানুষ

দেওয়ানি আদালতেও মানহানির মামলা করা যায়। সেখানে কারাদণ্ড নয়, ক্ষতিপূরণ। ভাইরাল পোস্টার যদি কারও চাকরি, সুনাম বা নিরাপত্তা নষ্ট করে, আর্থিক দাবি ওঠার পথ খোলা।

গুরুত্বপূর্ণ কথা: সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে চিন্তা ও বাকস্বাধীনতা স্বীকৃত। ন্যায্য সমালোচনা, জনস্বার্থের প্রশ্ন, সদাশয় বিশ্বাসে করা রিপোর্টিং—এগুলো সুরক্ষিত থাকার কথা। কিন্তু স্বাধীনতা মানে মিথ্যা বানানোর লাইসেন্স নয়। যাচাই না করে «ফ্যাক্ট চেক» নাম দিয়ে পোস্টার ছাপানো সেই সুরক্ষার বাইরে চলে যায়।

পেজ, শেয়ারার ও নির্মাতা—দায় কার

পোস্টার যে বানায়, সে দায় এড়াতে পারে না। যে পেজ যাচাই ছাড়া সেটি প্রকাশ করে, তারও দায়। যে ব্যক্তি জেনে-শুনে মিথ্যা দাবি শেয়ার করে, আইন তাঁকেও «প্রকাশক» হিসেবে দেখতে পারে। «আমি তো শুধু শেয়ার করেছি»—এই অজুহাত আদালতে সবসময় রক্ষা করে না।

রাজনৈতিক দলের পেজ থেকে ছড়ালে দায় আরও ভারী হয়। কারণ পাঠক সেটাকে দলের অবস্থান ভেবে নেয়। যাচাইয়ের দায়িত্ব তখন ব্যক্তি-আইডির চেয়ে বড়।

রিভার্স নিউজের অবস্থান

জাইমা রহমানের নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়। অভিজ্ঞতার তুলনা তোলা যায়। স্বজনপ্রীতির রাজনৈতিক বিতর্ক তোলা যায়। সেই বিতর্ক গণতন্ত্রের অংশ।

যা করা যায় না—প্রমাণহীন চাকরি খোঁজার গল্প বানানো, পিউপিলেজ না থাকাকে পুরো যোগ্যতা শূন্য বলা, আগের সভাপতির অফিসে লিগাল পদই ছিল না বলে কাটা, আর সেই মিশ্রণকে «ফ্যাক্ট» নাম দিয়ে ছড়ানো।

রিভার্স নিউজের রায় এক লাইনে: নিয়োগ সত্য, পোস্টার বিভ্রান্তিকর। যারা যাচাই ছাড়া এমন পোস্টার তৈরি ও প্রচার করেন, তাঁরা শুধু নৈতিক দায় নন—প্রচলিত দণ্ডবিধি ও সাইবার আইনের আওতায়ও পড়তে পারেন। আইনমতে শাস্তির বিধান আছে। প্রয়োগ আদালতের কাজ। আমাদের কাজ সত্য-মিথ্যা আলাদা করে পাঠককে বলা।

রিভার্স নিউজ ডেস্ক · ঢাকা · ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, বিকেল ৩টা ৪৩ মিনিট