রিভার্স নিউজ ডেস্ক: রাজধানীর পল্টনে প্রকাশ্যে গুলিবিদ্ধ হওয়ার ছয় দিন পর মারা যান ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও ঢাকা-৮ আসনের স্বতন্ত্র প্রার্থী শরীফ ওসমান বিন হাদি। হত্যার পর শুটার শনাক্ত হয়েছে, অভিযোগপত্রে কথিত পরিকল্পনাকারীর নামও এসেছে। কিন্তু বাদীপক্ষ সেই তদন্ত প্রত্যাখ্যান করার পর সিআইডির অধিকতর তদন্ত প্রতিবেদন এখন পর্যন্ত ২০ বার পিছিয়েছে।

এর মধ্যেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি হল থেকে শিক্ষার্থীদের বসানো ‘শহীদ ওসমান হাদি হল’ নামফলক সরিয়ে আগের নাম ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।

এই প্রতিবেদন কোনো অপ্রমাণিত দাবিকে সত্য হিসেবে উপস্থাপন করছে না। নিচে যা বলা হয়েছে, তা অভিযোগপত্র, আদালতের তারিখ এবং সংশ্লিষ্টদের প্রকাশ্য বক্তব্যের ভিত্তিতে। চূড়ান্ত সত্য নির্ধারণ করবেন আদালত ও তদন্তকারী সংস্থা।

বন্দুকধারী শনাক্ত, কিন্তু পুরো পরিকল্পনার উত্তর কোথায়

ডিবির অভিযোগপত্রে সাবেক কাউন্সিলর ও যুবলীগ নেতা তাইজুল ইসলাম চৌধুরী বাপ্পিকে হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনাকারী হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এটি অভিযোগপত্রের উল্লেখ, আদালতে প্রমাণিত রায় নয়। মামলার বাদী ও ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবের এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট হননি। তার নারাজির পর আদালত সিআইডিকে অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেয়।

জাবের প্রকাশ্য কর্মসূচিতে দাবি করেছেন, হত্যাকাণ্ডের পেছনে আরও বড় একটি চক্র রয়েছে। এটি তার অভিযোগ। সিআইডির চলমান তদন্তে এর সত্যতা এখনো চূড়ান্তভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়—শুটার ও কথিত নির্দেশদাতার বাইরে আর কেউ ছিল কি? অর্থ, অস্ত্র, পরিকল্পনা এবং সীমান্ত পার হওয়ার পুরো নেটওয়ার্ক কারা পরিচালনা করেছে? এসবের উত্তর এখনো তদন্তের অংশ।

২০ বার সময়, উত্তর কতদূর

২৭ সেপ্টেম্বরও সিআইডি অধিকতর তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি। আদালত এবার ৩ নভেম্বর নতুন তারিখ নির্ধারণ করেছেন।

হাদির বোন মাসুমা আক্তারও প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলেছেন—ফয়সাল একাই কি এমন ঘটনা ঘটাতে পারে? তাকে কারা সহযোগিতা করেছে এবং সীমান্ত পার হওয়ার সুযোগ কীভাবে তৈরি হলো—রাষ্ট্রের কাছে এসবের ব্যাখ্যা চেয়েছেন তিনি।

হাদি হত্যার বিচার নিয়ে এনসিপির আহ্বায়ক ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম পরিচিত মুখ নাহিদ ইসলামও বলেছেন, এই হত্যার বিচারের প্রশ্নে কোনো আপস হওয়া উচিত নয়।

অর্থাৎ প্রশ্নটি এখন শুধু একটি পরিবারের নয়। ২০ বার সময় বাড়ানোর পরও তদন্ত অসম্পূর্ণ থাকলে সাধারণ মানুষের সামনে তদন্তের অগ্রগতি স্পষ্ট করা কি রাষ্ট্রের দায়িত্ব নয়?

হেফাজত থেকে পলাতক আসামি সুলতান, দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ

এক বালতি রঙে কি মুছে যাবে স্মৃতি

হাদির মৃত্যুর পর ২০২৫ সালের ২০ ডিসেম্বর শিক্ষার্থীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শেখ মুজিবুর রহমান হলের প্রবেশপথে ‘শহীদ ওসমান হাদি হল’ নামফলক বসান। নামটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন পায়নি। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভাষ্য, সিনেটের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আগের নাম বহাল রাখতেই নামফলক সরানো হয়েছে।

কিন্তু এখানেও বিতর্ক থামেনি।

ডাকসুর সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পাদক মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদ প্রশাসনকে শিক্ষার্থীদের মতামত নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তার বক্তব্যের মূল কথা—কোনো নির্দিষ্ট নাম চাপিয়ে না দিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হোক।

তাহলে প্রশ্ন—একটি নামফলক সরানোই কি সমাধান, নাকি শিক্ষার্থীদের মতামত নিয়ে স্বচ্ছ সিদ্ধান্ত নেওয়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য অধিক গ্রহণযোগ্য পথ?

চব্বিশের রক্তের পর মানুষের প্রত্যাশা কোথায়

২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর ছাত্র-জনতার বড় প্রত্যাশাগুলোর একটি ছিল—হত্যা ও রাজনৈতিক সহিংসতার তদন্তে জবাবদিহিতা থাকবে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান প্রশ্নের উত্তর দেবে।

হাদি নিজেও জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সামনের সারির একজন কর্মী ছিলেন। তার হত্যার বিচার দাবিতে বিভিন্ন সময়ে শিক্ষার্থী, পরিবার ও রাজনৈতিক কর্মীরা রাস্তায় নেমেছেন।

এই বাস্তবতায় সাধারণ নাগরিকের প্রশ্ন খুব জটিল নয়। একজন প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মীকে গুলি করে হত্যার পরও যদি পূর্ণ তদন্তের জন্য ২০ দফা সময় লাগে, তাহলে দ্রুত ও স্বচ্ছ বিচার পাওয়ার নিশ্চয়তা কোথায়?

আবার বিশ্ববিদ্যালয়ে তার নাম রাখা বা সরানোর সিদ্ধান্ত যদি শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিতর্ক সৃষ্টি করে, তাহলে সেই সিদ্ধান্তও কেন খোলামেলা আলোচনার মাধ্যমে হবে না?

অর্থনৈতিক ধাক্কায় দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে বাংলাদেশের ৬.২ কোটি মানুষ

চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর মানুষের প্রত্যাশা ছিল—ক্ষমতার মুখ বদলের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানগুলোর জবাবদিহিতাও বদলাবে।

হাদি হত্যার তদন্ত তাই এখন একটি মামলার সীমানা ছাড়িয়ে বড় একটি প্রশ্ন সামনে আনছে—রাষ্ট্র কি তদন্তের মাধ্যমে সব প্রশ্নের উত্তর সামনে আনবে, নাকি সময়ের সঙ্গে প্রশ্নগুলোই চাপা পড়ে যাবে?

দায়মুক্তির নোট

রিভার্স নিউজ কোনো ব্যক্তি বা সংস্থাকে এই প্রতিবেদনের মাধ্যমে দোষী সাব্যস্ত করছে না। ডিবির অভিযোগপত্রে কারও নাম আসা, বাদীপক্ষের নারাজি, বা পরিবারের প্রশ্ন—এগুলো প্রকাশ্য তথ্য। এগুলো অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার সমান নয়।

চলমান তদন্তের চূড়ান্ত সত্য নির্ধারণ করবেন আদালত ও সংশ্লিষ্ট তদন্তকারী সংস্থা। জনস্বার্থে প্রশ্ন তোলা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কাছে জবাবদিহিতা চাওয়া সংবাদমাধ্যমের দায়িত্ব।

রিভার্স নিউজ ডেস্ক · ঢাকা · ১ অক্টোবর ২০২৬, বিকেল ৩টা ৪২ মিনিট ০০ সেকেন্ড