রিভার্স নিউজ ডেস্ক: দুর্গাপুর থানার তদন্তকারী কর্মকর্তা আজ সন্ধ্যায় ঘটনাস্থল দেখে একটা সময় বেঁধে দিয়েছেন। কাল দিনের মধ্যে বাঁশের বেড়া ও রাতের আড্ডার ভাঙা ঘর সরাতে হবে। না সরালে পুলিশ, সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও অন্য বাহিনী মিলে উচ্ছেদ করবে। এই আলটিমেটাম এখনো বহাল থাকার কথা। প্রশ্ন হলো, এরপরও ৬ নং কাঁকেরগড়া ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার মো. জামাল উদ্দীন কীভাবে বিষয়টি আবার গ্রাম্য শালিসে ফেরান।

ভুক্তভোগীরা আগেই রিভার্স নিউজকে জানিয়েছিলেন। এখন তদন্তের পালা। ডেস্ক নিজেই প্রশ্ন তুলছে। কারণ ওই বাড়িতে কথা বলার মতো প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ নেই। আছেন দুজন নারী ও এক কিশোর। পুলিশের সামনে শক্ত করে ব্যাখ্যা দেওয়ার কেউ নেই। তাই আইন যেন শালিসের নিচে চাপা না পড়ে, সেটা বলার দায়িত্ব এ প্রতিবেদনের।

ঘরটা যাঁদের

অভিযোগকারী মোছা. জোবেদা খাতুন, বয়স ৭০। স্বামী মৃত আশক আলী। ঠিকানা আতকাপাড়া, ৬ নং কাঁকেরগড়া ইউনিয়ন, দুর্গাপুর থানা, নেত্রকোনা। অভিযোগপত্রে বাদীর ওয়ার্ড আলাদা করে লেখা নেই। মেম্বার নিজেই ৪ নম্বর ওয়ার্ডের। সঙ্গে আছেন আর একজন নারী। ছেলের ছেলে মো. ইমরান হোসেন (১৮)। এই তিনজন। দ্বিতীয় নারীর নাম অভিযোগপত্রে আলাদা করে লেখা নেই।

অভিযোগপত্রে লেনদেন ও তিন আসামি

কাকেরগড়া মৌজায় স্বামীর দুই আনা হিস্যা সূত্রে জোবেদা খাতুনের নামে প্রায় ৮.০০ শতাংশ বসত ভিটা। ১ নম্বর আসামির নিজের জমি ছিল না। স্বামী জীবিত থাকতে তাঁকে এই ভিটায় টিনের ছাপড়া তুলে থাকতে দেওয়া হয়। স্বামীর মৃত্যুর পর ঘর ভেঙে চলে যেতে বললে আসামি বলেন, মৃত আশক আলীর কাছে তাঁর ৯০,০০০ টাকা পাওনা। তাঁর কথামতো স্থানীয় লোকজনসহ মোট ১,১০,০০০ টাকা দেওয়া হয়েছে। দখল ছাড়েননি।

আসামি তিনজন। সবাই আতকাপাড়া, ৬ নং কাকেরগড়া ইউপি।

১. মো. আবুল বাশার (৩৫), পিতা মৃত ওমর আলী।

২. মো. জাহাঙ্গীর আলম (২৫), পিতা মো. ছামেদ আলী।

৩. মো. নুর জামাল (৩০), পিতা মো. ছামেদ আলী।

২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, বিকাল ৪টা। তিনজন বাঁশের লাঠি নিয়ে বাড়ির সামনে আসেন। অশ্লীল গালি। জোবেদা খাতুন ও ইমরান হোসেন প্রতিবাদ করলে মারধরের ভঙ্গি এবং খুন-জখমের হুমকি। এগুলো থানায় জমা অভিযোগ। রায় নয়।

দুই শালিস: ৪, ৬, তারপর ৮ শতাংশ

এর আগে দুটি শালিস হয়েছে। পরিবার বলছে, দুটিই একতরফা, ভিত্তিহীন এবং টাকার বিনিময়ে। যেখানে ঘর উঠেছে, সেই জায়গা ধরে ৪ শতাংশ ছাড়ের কথা বলা হয়েছিল। জোবেদা খাতুন বলেছেন, এক শতাংশও দেবেন না। এটা স্বামীর রেখে যাওয়া ওয়ারিশি ভিটা।

শালিসের একাধিক কণ্ঠ বলেছে ৬ শতাংশ নিয়ে দিতে। জমি মাপেন যাঁরা, তাঁদের দিক থেকে শোনা গেছে, প্রয়োজনে ৮ শতাংশও ছেড়ে দেওয়া যাবে। পরিবারের পক্ষে কেউ কথা বলতে গেলে তাঁকে অপেক্ষায় রাখা হয়েছে। টাকা দিয়ে শালিস ভারী করার এই অভিযোগ আতকাপাড়ায় একটি নয়। রিভার্স নিউজের কাছে জনপ্রতিনিধিদের টাকার শালিস নিয়ে একাধিক নালিশ আছে।

শালিসে যাঁদের মূল নাম এসেছে। এছাড়াও আরও মানুষ ছিলেন।

হেফাজত থেকে পলাতক আসামি সুলতান, দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ

১. মো. জামাল উদ্দীন। ৬ নং কাঁকেরগড়া ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার। নিজের ঈদবার্তার পোস্টারে নামের পাশে ড্রাইভার লেখা আছে।

২. সালাম (আমিন)। জমি মাপার কাজে ছিলেন।

৩. শেকুল চৌধুরী। মাতব্বর।

৪. রাজা। হাশিম চেয়ারম্যানের ছেলে, ইউনিয়ন বিএনপির সেক্রেটারি।

৫. আব্দুল জব্বার। বিশ্বনাথপুর, বিএনপির গ্রাম সভাপতি।

৬. হাকিম মোড়ল। পাশের গ্রামের শালিশকারী।

৭. সাইদুল। স্থানীয় বিএনপি নেতা।

৮. খায়রুল। কৃষ্ণের চর, বিএনপির পদধারী।

৯. শাহীন। প্রতিবেশী গ্রাম।

মেম্বার যা পারেন, যা পারেন না

ইউনিয়ন পরিষদ আইন, ২০০৯ অনুযায়ী ওয়ার্ড মেম্বার স্থানীয় উন্নয়ন, সেবা ও পরিষদের কাজে থাকেন। তিনি ম্যাজিস্ট্রেট নন। ফৌজদারি তদন্ত থামানো, পুলিশের আলটিমেটাম স্থগিত করা বা কারও ওয়ারিশি ভিটা শালিসে কেটে দেওয়ার ক্ষমতা এই আইনে নেই। অসদাচরণে চেয়ারম্যান বা সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত ও অপসারণের বিধানও ওই আইনে আছে।

দুর্গাপুরে রাতারাতি লাখপতি ৫ জন, নেপথ্যে কে এই সাত্তার মাস্টার

গ্রাম আদালত আইন, ২০০৬-এর শালিসও আলাদা জিনিস। সেটা নির্দিষ্ট তফসিলের ছোট মামলা, নির্দিষ্ট গঠন। খুনের হুমকি, পুলিশের কাজে বাধা বা জমির মালিকানা ওই তফসিলে পড়ে না। হাইকোর্ট আগেই বলেছেন, শালিস বা ফতোয়া দিয়ে আইনের বাইরে শাস্তি বা নিষ্পত্তি চলে না।

অভিযোগ সত্য হলে যে ধারাগুলো সামনে আসে: দণ্ডবিধি ১৮৬ (সরকারি কাজে বাধা), ১৮৮ (প্রকাশ্য আদেশ অমান্য), ৪৪৭ (ফৌজদারি অনধিকার প্রবেশ), ৫০৩ ও ৫০৬ (খুনের ভয় দেখানো), ৫০৯ (নারীকে অশ্লীল গালি)। টাকা আদায়ের অভিযোগ প্রমাণিত হলে ৩৮৪ও আলোচনায় আসে। এগুলো আদালত দেখবে। শালিসের টেবিল নয়।

যাঁদের কাছে প্রশ্ন

সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্যে, ২৮ এপ্রিল ২০২৬ থেকে দুর্গাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা খন্দকার শাকের আহমেদ। ৭ সেপ্টেম্বর জেলা পুলিশ তাঁকে টানা তৃতীয়বার শ্রেষ্ঠ ওসি বলেছে। রিভার্স নিউজ ডেস্ক তাঁকে জিজ্ঞেস করছে: আজ সন্ধ্যার আলটিমেটাম কি কাল দিনের মধ্যে বহাল থাকবে, নাকি একজন মেম্বারের শালিসে সেটা থেমে যাবে।

একই প্রশ্ন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও ভূমি মন্ত্রণালয়ের কাছে। ৮ শতাংশ ভিটার দখল সহকারী কমিশনার (ভূমি) দেখবেন, নাকি আমিনের মুখের ৪-৬-৮ শতাংশই শেষ কথা।

নেত্রকোনা-১ (দুর্গাপুর-কলমাকান্দা) আসনের সাংসদ ও জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল আগেই বলেছিলেন, জমির বিরোধ টাকার শালিসে নয়, থানা ও আদালতে মিটতে হবে। রিভার্স নিউজ অসহায় মানুষের কথা তাঁর কাছে রাখছে। আজকের পুলিশি সময়সীমা যেন মেম্বারের শালিসে ভেস্তে না যায়।

জামাল উদ্দীন মেম্বার ৬ নং কাঁকেরগড়া ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের প্রতিনিধি। পুলিশের কাজে বাধা দেওয়ার এখতিয়ার তাঁর নেই। বাধা দিলে কী ব্যবস্থা হয়, সেই জবাব এখন দুর্গাপুর থানা, ইউএনও ও জেলা প্রশাসনের।

রিভার্স নিউজ ডেস্ক · দুর্গাপুর, নেত্রকোনা · ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, রাত ৯টা ২৮ মিনিট ০০ সেকেন্ড