রিভার্স নিউজ ডেস্ক: নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার কাকৈরগড়া ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের আতকাপাড়া গ্রামে জমি সংক্রান্ত বিরোধ ও সুদের টাকার জের ধরে একটি অসহায় পরিবারকে গ্রাম্য শালিসের নামে চরম হয়রানি ও মানসিকভাবে নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। পরিবারটিতে প্রতিবাদ করার মতো শক্ত কোনো পুরুষ বা অভিভাবক না থাকায়, একটি প্রভাবশালী চক্র মিথ্যা সাক্ষী সাজিয়ে একতরফাভাবে বারবার শালিসের রায় নিজেদের পক্ষে নিচ্ছে। অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে দুর্গাপুর প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ভুক্তভোগী ও স্থানীয় সচেতন মহল।
ঘটনাস্থল নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলার কাকৈরগড়া ইউনিয়ন, ৬ নম্বর ওয়ার্ড, আতকাপাড়া গ্রাম।
পরিবার কী বলছে
পরিবারের বক্তব্য অনুযায়ী, মৃত আজিজুল হক সুদে ৯০ হাজার টাকা নিয়েছিলেন। লাভ-সুদসহ সেই অঙ্ক দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১০ হাজার টাকায়। আনুমানিক পাঁচ মাস আগে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি মারা যান। টাকা শোধ করতে না পারায় পাওনার জেরে বসবাসের কথা ওঠে প্রায় চার শতক জমি নিয়ে। জমিটি তাঁর মা জুবায়দার নামে।
জুবায়দা তখন মেয়েদের বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিলেন। এই সুযোগে অভিযুক্ত পক্ষ ওই জমিতে ঘর তোলার প্রস্তুতি নেয়। মা ফিরে আসার পর তিনি ও পরিবারের সদস্যরা তাঁদের নিষেধ করেন। অভিযোগ, নিষেধ সত্ত্বেও আজিজুল হক তখনো জীবিত থাকাকালেই তাঁরা জোর করে জমিতে ঘর তোলেন।
ঝড়ে ঘর ভাঙে, এখন আবার ঘর বাঁধার চেষ্টা
গত বৈশাখ মাসে কালবৈশাখী ঝড়ে সেই ঘর ভেঙে পড়ে। এরপর অভিযুক্তরা এলাকা ছেড়ে ঢাকায় চলে যান। এখন তাঁরা ফিরছেন এবং জায়গাটি আবার তৈরি করে নতুন করে ঘর বাঁধার প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে পরিবার জানিয়েছে।
ঘর বাঁধার আগে জমি যাঁদের, সেই অসহায় পরিবার টাকা ফেরতের প্রস্তাব দেয়। জুবায়দার বক্তব্য—আগেও নিষেধ করা হয়েছিল। ছেলে আর বেঁচে নেই। যে টাকা তাঁরা পাবেন, সেটি ফিরিয়ে দেওয়া হবে। ঘর তোলার দরকার নেই। অভিযুক্তরা এতে রাজি না হয়ে ক্ষুব্ধ হন।
হেফাজত থেকে পলাতক আসামি সুলতান, দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগদুই শালিসে একই কথা
ক্ষুব্ধ হয়ে তাঁরা স্থানীয় চেয়ারম্যান, মেম্বার ও গ্রামের মাতাব্বরদের দিয়ে শালিস করান। পরপর দুটি গ্রাম্য শালিস হয়। পরিবারের অভিযোগ, দুটি শালিসেই মিথ্যা সাক্ষী সাজানো হয়েছে। রায়ের বড় অংশ টাকার বিনিময়ে, একতরফা। দুই শালিসেই তাঁদের এক কথা শোনানো হয়: কথা ছিল চার শতক, নেওয়া হবে ছয় শতক। মাতাব্বররা বলেছেন, প্রয়োজন হলে আট শতকও নেওয়া হবে।
আরও একটি কথা শালিসে উঠেছে। মৃত আজিজুল হকের ছেলে প্রবাসে থাকায় ঘরে প্রতিবাদ করার মতো অভিভাবক নেই। এমন হুমকিও শোনা গেছে যে, ঘরের ইট খুলে নিয়ে যাওয়া হবে। প্রতিবাদ করার কেউ নেই বলেই এতটা সাহস—পরিবার এভাবেই প্রশ্ন তুলছে।
থানায় ফয়সালার পরামর্শ
জানা যায়, স্থানীয় পর্যায়ে ন্যায়বিচারের স্বার্থে এলাকার সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব ব্যারিস্টার কায়সার কামাল এই বিষয়টি গ্রাম্য শালিসের বদলে থানায় আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ফয়সালা করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেছিলেন, গ্রাম্য শালিসে প্রায়ই টাকার বিনিময়ে পক্ষপাতদুষ্ট রায় দেওয়া হয় এবং প্রভাবশালীদের পক্ষ নেওয়া হয়। তার এই যৌক্তিক সতর্কবার্তার পরও এলাকায় পরপর দুটি গ্রাম্য শালিস অনুষ্ঠিত হয়। অভিযোগ রয়েছে, উভয় শালিসেই টাকার জোরে মিথ্যা সাক্ষী উপস্থাপন করে ওই অসহায় পরিবারটিকে কোণঠাসা করা হয়েছে।
জমির দাম, নগদ মীমাংসা নয়
ঘটনার মূল সূত্রপাত একটি সুদের টাকার লেনদেনকে কেন্দ্র করে। ভুক্তভোগী পরিবারের যে জমিটি নিয়ে বিরোধ, বর্তমান বাজারদরে তার মূল্য প্রায় ৪ লাখ টাকা। পরিবার আগে পাওনাদারদের দেড় লাখ টাকা দিয়ে বিষয়টি মীমাংসা করতে সম্মত হয়েছিল। এখন তাঁরা অঙ্কটি স্পষ্ট করছেন—মূল ঋণ ৯০ হাজার, সুদসহ ১ লাখ ১০ হাজার। অভিযুক্তরা নগদ প্রস্তাবে নারাজ। তাঁরা পাওনা টাকার বদলে জমিই নিতে চান। চার শতকের কথা বলে ছয়, এমনকি আট শতক পর্যন্ত নেওয়ার কথা শালিসে উঠেছে।
অভিযোগ উঠেছে, এই জমি দখলে নিতে অভিযুক্তরা স্থানীয় চেয়ারম্যান, মেম্বারসহ বিভিন্ন প্রভাবশালীদের ব্যবহার করছে এবং যেকোনো মূল্যে জমিটি ছিনিয়ে নেওয়ার চক্রান্ত চালিয়ে যাচ্ছে। দুটি শালিস হওয়ার পরও তাঁরা কোনো নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে দিন দিন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন এবং পরিবারটিকে প্রতিনিয়ত চাপ দিচ্ছেন।
দুর্গাপুরে রাতারাতি লাখপতি ৫ জন, নেপথ্যে কে এই সাত্তার মাস্টাররক্তক্ষয়ের আগে পদক্ষেপ
বর্তমান পরিস্থিতিতে ওই অসহায় পরিবারটি চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। পরিস্থিতি যেদিকে এগোচ্ছে, তাতে যেকোনো সময় বড় ধরনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ বা দুর্ঘটনা ঘটার তীব্র আশঙ্কা রয়েছে। কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার আগেই দুর্গাপুর থানা ও প্রশাসনের কাছে দ্রুত তদন্ত ও আইনি পদক্ষেপের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা। দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা হলে তবেই ন্যায়বিচার মিলবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
এই প্রতিবেদন পরিবারের বক্তব্য ও স্থানীয় সূত্রের ভিত্তিতে। সরেজমিন তদন্ত শেষ হয়নি। কারও বিরুদ্ধে চূড়ান্ত অভিযোগ প্রমাণিত নয়। খতিয়ে দেখার দায়িত্ব দুর্গাপুর থানা ও উপজেলা প্রশাসনের।
রিভার্স নিউজ ডেস্ক · ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫, রাত ১০টা ১৫ মিনিট




