দুর্গাপুর (নেত্রকোনা) প্রতিনিধি: দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগে নেত্রকোনার দুর্গাপুর মহিলা ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ ফারুক আহমেদ তালুকদারের অপসারণ দাবিতে কর্মবিরতি শুরু করেছেন কলেজটির শিক্ষক-কর্মচারীরা।

বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) দুই শিক্ষক ছাড়া অন্য শিক্ষক-কর্মচারীরা কর্মসূচিতে অংশ নেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। দুই দিন সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত কর্মবিরতি চলার কথা।

তবে অধ্যক্ষকে ঘিরে বর্তমান বিরোধ নতুন নয়। তাঁর পূর্ববর্তী নিয়োগ, শিক্ষাগত যোগ্যতা এবং ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ হওয়ার প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা নিয়ে এর আগেও প্রশ্ন উঠেছে। বিষয়টি উপজেলা প্রশাসনের তদন্ত পেরিয়ে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) তদন্ত পর্যন্ত গড়ায়।

সর্বশেষ মাউশির নির্দেশে নেত্রকোনা সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক আবু তাহের খানের নেতৃত্বে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে ফারুক আহমেদ তালুকদারের নিয়োগ ও অভিজ্ঞতাসংক্রান্ত একাধিক বিষয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। একই তদন্তে সংশ্লিষ্ট আরও কয়েকটি নিয়োগে অসঙ্গতির কথাও উঠে আসে।

পরবর্তী সময়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) নিয়োগ, এমপিও, বেতন-ভাতা ও আর্থিক হিসাবসংক্রান্ত বিভিন্ন নথি তলব করে বলে সংশ্লিষ্ট কাগজপত্রে দেখা যায়।

এই তদন্ত ও অনুসন্ধানের ধারাবাহিকতার মধ্যেই এবার অধ্যক্ষের অপসারণ দাবিতে প্রকাশ্যে কর্মসূচিতে নেমেছেন শিক্ষক-কর্মচারীরা।

অধ্যক্ষের নিয়োগ ও অভিজ্ঞতা নিয়ে কী পেয়েছে তদন্ত

তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফারুক আহমেদ তালুকদার ২০০৩ সালে সুসং সরকারি কলেজে কম্পিউটার শিক্ষা বিষয়ে প্রভাষক হিসেবে নিয়োগ পান। ওই নিয়োগের সময়ে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় শিক্ষাগত যোগ্যতা তাঁর ছিল কি না, তা নিয়ে তদন্তে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।

২০১৪ সালে কলেজটি জাতীয়করণের জন্য মাউশির পরিদর্শনেও বিষয়টি উঠে আসে। পরবর্তীতে কলেজ জাতীয়করণ হলেও তিনি জাতীয়করণের আওতায় আসেননি।

এরপর তিনি দুর্গাপুর মহিলা ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ হন।

তদন্তে এখানেই আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে—তাঁর পূর্ববর্তী শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা ছিল উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ে কম্পিউটার শিক্ষা বিষয়ে। সেই অভিজ্ঞতা ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতা হিসেবে গ্রহণযোগ্য ছিল কি না।

অধ্যক্ষ পদে তাঁর এমপিও আবেদনে অভিজ্ঞতা কীভাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল, সেটিও তদন্তে প্রশ্নের মুখে পড়ে।

রিট চলার মধ্যেই নিয়োগ সাক্ষাৎকার

ফারুক আহমেদ তালুকদারের অধ্যক্ষ নিয়োগের সময় কলেজের অর্থনীতি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক গৌতম কুমার মল্লিক নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে আদালতে রিট করেছিলেন বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।

ওই রিট চলমান থাকা অবস্থায় ২০১৭ সালের ২২ জুলাই অধ্যক্ষ নিয়োগের সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়। সে সময় কলেজ পরিচালনা পর্ষদের নেতৃত্বে ছিলেন তৎকালীন সংসদ সদস্য ছবি বিশ্বাস।

রিট চলাকালে নিয়োগ প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার বিষয়টিও তদন্তে প্রশ্নের মুখে পড়ে।

দুদক চেয়েছে নিয়োগ থেকে বেতন-ভাতার হিসাব

সংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, দুদক ফারুক আহমেদ তালুকদারের অধ্যক্ষ পদে এমপিও আবেদন, নিয়োগসংক্রান্ত কাগজপত্র এবং যোগদানের পর থেকে সরকারি কোষাগার থেকে নেওয়া বেতন-ভাতার বছরভিত্তিক হিসাব তলব করেছে।

সুসং সরকারি কলেজে প্রভাষক হিসেবে তাঁর পূর্ববর্তী নিয়োগ ও এমপিওসংক্রান্ত নথিও চাওয়া হয়েছে।

হেফাজত থেকে পলাতক আসামি সুলতান, দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ

অর্থাৎ অনুসন্ধানটি শুধু বর্তমান অধ্যক্ষ পদে নিয়োগে সীমাবদ্ধ থাকেনি; তাঁর পূর্ববর্তী চাকরির রেকর্ডও এর আওতায় এসেছে।

৩৪ নম্বর পেয়েও দ্বিতীয়, ৩৩ নম্বরে প্রথম?

একই তদন্তে আলহাজ্ব মফিজ উদ্দিন তালুকদার কলেজের অধ্যক্ষ মোছা. কামরুননাহারের নিয়োগেও গুরুত্বপূর্ণ অসঙ্গতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

নিয়োগ পরীক্ষার নথিতে মোজাহিদুল ইসলাম ৩৪ নম্বর পেলেও একটি ফলাফল বিবরণীতে তাঁর নম্বর ৩২ দেখানো হয়। অন্যদিকে ৩৩ নম্বর পাওয়া কামরুননাহারকে প্রথম দেখানোর তথ্য তদন্তে উঠে আসে।

পরে বিষয়টিকে ‘মুদ্রণজনিত ত্রুটি’ হিসেবে সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে। কিন্তু তদন্ত দল মূল লিখিত পরীক্ষার খাতা দেখতে চাইলে তা উপস্থাপন করা যায়নি।

ফলে প্রশ্ন থেকে যায়—৩৪ নম্বর কীভাবে ৩২ হলো এবং প্রকৃত ফলাফল কোনটি?

একই সময়ে দুই চাকরি, নিবন্ধন সনদ নিয়েও প্রশ্ন

কামরুননাহারের চাকরির অভিজ্ঞতা নিয়েও তদন্তে অসঙ্গতির কথা বলা হয়েছে।

তদন্তসংশ্লিষ্ট নথি অনুযায়ী, তাঁকে ২০১৫ সালে কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদানকারী দেখানো হলেও একই সময় দুর্গাপুর দ্বীনি দাখিল মাদ্রাসায় সহকারী শিক্ষক হিসেবে কর্মরত থাকা এবং বেতন-ভাতা গ্রহণের তথ্য রয়েছে।

তাঁর শিক্ষক নিবন্ধন সনদ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, স্কুল পর্যায়ের ‘সহকারী শিক্ষক’ পদের নিবন্ধন সনদ কলেজে প্রভাষক পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়েছিল।

এ ছাড়া বিভিন্ন নথিতে তিনি ঠিক কবে অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন, সেই সময়কাল নিয়েও অসঙ্গতির তথ্য তদন্তে উঠে এসেছে।

বিদেশি সনদ ও চার ল্যাব সহকারীর নিয়োগ

দুর্গাপুর মহিলা ডিগ্রি কলেজের ইসলাম শিক্ষা বিষয়ের সহকারী অধ্যাপক আব্দুল আজিজের শিক্ষাগত যোগ্যতাও তদন্তের আওতায় আসে।

তদন্ত প্রতিবেদনে তাঁর ভারতের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে অর্জিত শিক্ষাগত সনদের কথা উল্লেখ থাকলেও বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রয়োজনীয় সমতা প্রত্যয়নপত্র বা Equivalence Certificate উপস্থাপনের প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

অন্যদিকে কলেজের চার ল্যাব সহকারী নিয়োগের ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

দুদক সংশ্লিষ্ট নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, আবেদনপত্র, নিয়োগ বোর্ড, ফলাফল শিট, শিক্ষাগত সনদ, এমপিও মঞ্জুরি এবং যোগদানের পর থেকে বেতন-ভাতার হিসাবসহ বিভিন্ন নথি তলব করেছে বলে সংশ্লিষ্ট কাগজপত্রে দেখা যায়।

দুর্গাপুরে রাতারাতি লাখপতি ৫ জন, নেপথ্যে কে এই সাত্তার মাস্টার

৯৭ হাজার টাকার হিসাব নিয়েও দুই ধরনের তথ্য

কলেজের ২০১৯-২০ অর্থবছরের অভ্যন্তরীণ অডিটে রশিদের মাধ্যমে আদায় করা ৯৭ হাজার টাকার হিসাব নিয়ে আপত্তি ওঠে।

অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা প্রতিবেদনে অর্থটি আয়ের হিসাব থেকে বাদ পড়া এবং পরে ব্যাংক হিসাবে জমা না হওয়ার বিষয়ে আপত্তি তুলে ঘটনাটিকে ‘অর্থ আত্মসাৎ হিসেবে প্রতীয়মান’ বলে পর্যবেক্ষণ দেওয়া হয়।

তবে পরবর্তী মাউশির তদন্তে ওই নির্দিষ্ট অর্থের বিষয়ে ভিন্ন পর্যবেক্ষণ রয়েছে। ফলে ৯৭ হাজার টাকার বিষয়টিকে চূড়ান্তভাবে আত্মসাৎ হিসেবে না দেখে সংশ্লিষ্ট অডিট ও আর্থিক নথির পূর্ণাঙ্গ যাচাইয়ের বিষয় হিসেবেই দেখা প্রয়োজন।

দুদক কলেজের বিভিন্ন বছরের অডিটসংক্রান্ত নথিও চেয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কাগজপত্রে উল্লেখ রয়েছে।

তদন্তের মধ্যেই এবার প্রকাশ্য কর্মবিরতি

এতদিন বিষয়গুলো অভিযোগ, সরকারি তদন্ত ও নথি তলবের মধ্যে ছিল। এবার সেই বিরোধ কলেজের স্বাভাবিক কার্যক্রমে এসে পড়েছে।

অধ্যক্ষের অপসারণ দাবিতে শিক্ষক-কর্মচারীরা প্রকাশ্যে কর্মবিরতিতে নেমেছেন। কর্মসূচিতে অংশ না নেওয়া দুই শিক্ষকের বিরুদ্ধেও সনদ ও নিয়োগসংক্রান্ত অনিয়ম এবং অধ্যক্ষের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে কাজ করার অভিযোগ তুলেছেন আন্দোলনসংশ্লিষ্টরা। তবে এসব অভিযোগের চূড়ান্ত নিষ্পত্তির তথ্য পাওয়া যায়নি।

এদিকে টানা কর্মসূচিতে সবচেয়ে সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে শিক্ষার্থীদের ওপর। নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হওয়ার আগেই চলমান বিরোধের দ্রুত নিষ্পত্তি চান সংশ্লিষ্টরা।

মাউশির তদন্তে কোনো বিষয়ে প্রশ্ন ওঠা কিংবা দুদকের নথি তলব করা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অপরাধ চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হওয়ার সমতুল্য নয়। অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য ও কর্তৃপক্ষের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তও বিবেচ্য।

নিজস্ব প্রতিনিধি · দুর্গাপুর, নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ · ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, বিকেল ৫টা ৪১ মিনিট ০০ সেকেন্ড