Reverse News Crime Investigation Desk | দুর্গাপুর, নেত্রকোনা: নেত্রকোনার দুর্গাপুর সীমান্ত। একদিকে পাহাড়, অন্যদিকে সোমেশ্বরী নদী। এই সীমান্তঘেঁষা জনপদে গত নয় মাসে বিজিবির হাতে জব্দ হয়েছে ১২ কোটি টাকার বেশি মূল্যের মাদক ও বিভিন্ন চোরাচালানি পণ্য।
সংখ্যাটি শুধু একটি অভিযানের নয়। জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত বিভিন্ন অভিযানের সম্মিলিত হিসাব এটি।
নেত্রকোনা ব্যাটালিয়ন (৩১ বিজিবি) জানিয়েছে, এই সময়ে মোট ১২ কোটি ২০ লাখ ৩৪ হাজার ৪৪ টাকা মূল্যের মাদকদ্রব্য ও অন্যান্য চোরাচালানি পণ্য জব্দ করা হয়েছে।
জব্দ করা পণ্যের তালিকাও ছোট নয়। ভারতীয় মদ, ফেনসিডিল, ইয়াবা, স্কাফ সিরাপ, বিয়ার, গাঁজা থেকে শুরু করে খাদ্যপণ্য, কসমেটিকস, পোশাক, গবাদিপশু, কয়লা, চিনি, ওষুধ, জিরা, সুপারি, রসুন, মাছ ও মাছের পোনা পর্যন্ত রয়েছে সেই তালিকায়।
এর মধ্যে মাদকদ্রব্যের আনুমানিক মূল্য প্রায় ৫২ লাখ ৮৫ হাজার টাকা। অন্যান্য চোরাচালানি পণ্যের মূল্য প্রায় ১১ কোটি ৬৭ লাখ টাকা।
জব্দ হচ্ছে কোটি টাকার পণ্য, প্রশ্নটা তাই অন্য জায়গায়। বিজিবির এই অভিযান সীমান্ত নজরদারির একটি বড় চিত্র সামনে আনে। কিন্তু একই সঙ্গে জব্দ হওয়া পণ্যের বিপুল পরিমাণ একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তৈরি করে। নয় মাসে যদি ১২ কোটি টাকার বেশি পণ্য ধরা পড়ে, তাহলে সীমান্ত দিয়ে মোট কত টাকার অবৈধ পণ্য চলাচলের চেষ্টা হয়েছে?
এই প্রশ্নের উত্তর প্রকাশিত পরিসংখ্যানে নেই।
জব্দের তথ্য থেকে এটাও নির্ধারণ করা যায় না যে আটক পণ্য মোট অবৈধ প্রবাহের কত শতাংশ। ফলে শুধু জব্দের অঙ্ক দেখে সীমান্ত দিয়ে মোট চোরাচালানের পরিমাণ নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
তবে এত বড় অঙ্কের জব্দ দেখাচ্ছে, সীমান্তে নজরদারির প্রয়োজন এখনও যথেষ্ট রয়েছে।
নজরে সোমেশ্বরীর নদীপথ। বিজিবির তথ্য অনুযায়ী, দুর্গাপুরের বিজয়পুর ও ভবানীপুর এলাকার সোমেশ্বরী নদীপথে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে।
নদীর দুই পাশে সিসি ক্যামেরা, সোলার ব্যবস্থা ও হ্যালোজেন লাইট স্থাপন করা হয়েছে। সম্ভাব্য চলাচলের এলাকাগুলোতে টহলও বাড়ানো হয়েছে।
বিজিবি বলছে, চোরাচালান ঠেকাতে স্থানীয় সূত্র থেকে তথ্য সংগ্রহ, জনসচেতনতামূলক সভা, উঠান বৈঠক এবং মাইকিংও করা হচ্ছে।
প্রশ্ন হচ্ছে, নদীপথে সিসি ক্যামেরা বসানোর প্রয়োজন কেন তৈরি হলো? অতীতে এই পথ দিয়ে কী ধরনের পণ্য বেশি আসছিল? ক্যামেরা স্থাপনের পর পরিস্থিতির পরিবর্তন কতটা হয়েছে?
ব্রেকিংএই তথ্যগুলো প্রকাশ্যে এলে সীমান্ত পরিস্থিতির আরও পরিষ্কার ছবি পাওয়া যাবে।
কয়লা ও অন্যান্য পণ্যের বড় অঙ্ক। বিজিবির প্রকাশিত হিসাব অনুযায়ী, সোমেশ্বরী নদীর ভবানীপুর ও বিজয়পুর এলাকার বিভিন্ন স্থান থেকে নয় মাসে প্রায় ১ কোটি ৩৫ লাখ ৬৪ হাজার টাকার কয়লা এবং ৭৩ লাখ টাকার বেশি মূল্যের অন্যান্য সামগ্রী জব্দ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ থেকে সার, জ্বালানি তেল, পেঁয়াজ ও রসুন সীমান্তের ওপারে পাচারের বিষয়েও বিশেষ নজরদারি চালানোর কথা জানিয়েছে বিজিবি।
বিজিবি অধিনায়কের ভাষ্য অনুযায়ী, বিপুল পরিমাণ রসুন জব্দ করা হলেও ওই সময় সার বা জ্বালানি তেল পাচারের ঘটনা তাদের নজরে ছিল না।
আটক কতজন? প্রকাশিত বিজিবি প্রেস নোটের ভিত্তিতে কয়েকটি সংবাদমাধ্যম জানায়, জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বরের অভিযানে মোট ১৮ জনকে আটক করা হয়েছে।
অন্যদিকে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়ে বিজিবি অধিনায়কের বক্তব্য উদ্ধৃত করে একটি প্রতিবেদনে গত পাঁচ মাসে ১৭ জনকে আটক করে পুলিশের কাছে হস্তান্তরের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
দুটি সংখ্যা ভিন্ন সময়সীমা বা ভিন্ন ধরনের অভিযানের হিসাব হতে পারে। পূর্ণ মামলাভিত্তিক তালিকা প্রকাশিত হলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে।
পণ্য ধরা পড়ছে, কিন্তু নেটওয়ার্ক কোথায়? সীমান্ত অপরাধের অনুসন্ধানে শুধু কত বোতল মদ, কত কেজি পণ্য অথবা কত টাকার মালামাল জব্দ হলো, সেটাই শেষ প্রশ্ন নয়। আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—এই পণ্য কারা বহন করছে? কার কাছে পৌঁছানোর কথা ছিল? একই রুট কি বারবার ব্যবহার হচ্ছে? আটক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে হওয়া মামলাগুলোর বর্তমান অবস্থা কী? জব্দের ঘটনায় মূল অর্থদাতা বা সংগঠকের সন্ধান কতবার পাওয়া গেছে?
প্রকাশিত তথ্যগুলো এসব প্রশ্নের পূর্ণ উত্তর দেয় না।
তাই কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে প্রমাণ ছাড়া চোরাচালানের সঙ্গে যুক্ত করার সুযোগ নেই। কিন্তু মামলার নথি, আটক ব্যক্তিদের তথ্য এবং আদালতের পরবর্তী কার্যক্রম পর্যালোচনা করলে সীমান্ত অপরাধের কাঠামো সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া সম্ভব।
বিজিবির অবস্থান। নেত্রকোনা ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল তৌহিদুল বারী জানিয়েছেন, চোরাচালান, অবৈধ সীমান্ত পারাপার এবং নারী ও শিশু পাচারসহ সীমান্তসংক্রান্ত অপরাধ ঠেকাতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
বিএসএফের সঙ্গে সমন্বিত টহল, স্থানীয় পর্যায়ে সচেতনতা কার্যক্রম এবং প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারিও বাড়ানোর কথা জানিয়েছে বিজিবি।
Reverse News-এর অনুসন্ধানের জায়গা। ১২ কোটি টাকার পণ্য জব্দ হওয়ার খবর বড়। কিন্তু এর পরের গল্পটি আরও গুরুত্বপূর্ণ।
জব্দ হওয়া মালামালের পেছনে কি বিচ্ছিন্ন ছোট ছোট ঘটনা, নাকি একই পথ ও একই ধরনের সরবরাহব্যবস্থা বারবার ব্যবহৃত হচ্ছে?
এ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যাবে শুধু মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে।
Reverse News পর্যায়ক্রমে জব্দের স্থান, সংশ্লিষ্ট মামলা, আটক ব্যক্তিদের আইনি অবস্থা এবং সীমান্তের গুরুত্বপূর্ণ রুটগুলোর তথ্য যাচাই করে বিষয়টির পরবর্তী দিকগুলো অনুসন্ধান করবে।
কারণ সীমান্তে কত টাকার পণ্য ধরা পড়েছে—এটা খবর। কিন্তু এত পণ্য সেখানে পৌঁছাচ্ছে কীভাবে—সেটাই অনুসন্ধানের বিষয়।
Reverse News Crime Investigation Desk | দুর্গাপুর, নেত্রকোনা। ৩ অক্টোবর ২০২৬, রাত ৮টা ২১ মিনিট।

