সম্পাদকীয় ডেস্ক: একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব তার নাগরিকদের জীবনের নিরাপত্তা। এর পাশে অর্থনৈতিক মুক্তি, সুশাসন ও উন্নত জীবনযাত্রা। এগুলো না থাকলে দেশের নাম উন্নত হয় না। বিগত দিনের চ্যালেঞ্জ, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনা থেকে বেরিয়ে একটি নতুন বাংলাদেশ, অনেকে যাকে নিউ বাংলাদেশ বলছেন, গড়তে রাষ্ট্রকাঠামোর প্রতিটি স্তরে আমূল সংস্কার লাগে। জাতীয় নিরাপত্তা থেকে জনস্বাস্থ্য—সব মিলিয়ে এই রূপরেখা। এটা সরকারি ঘোষণা নয়। সম্পাদকীয় ডেস্কের ব্যাখ্যা। নাগরিক যা পাবেন, সেটাও এখানে স্পষ্ট।
রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, পররাষ্ট্রনীতি ও শাসন
সার্বভৌমত্ব রক্ষা ও আধুনিক প্রতিরক্ষা। রাষ্ট্রের সবার আগে কাজ মানুষের জীবন রক্ষা। কোনো রাষ্ট্র—ইসরায়েল হোক, বা আন্তর্জাতিক শিষ্টাচার ভাঙা অন্য কোনো দেশ—হঠাৎ বাংলাদেশের ওপর ক্ষেপণাস্ত্র বা সামরিক হামলা চালালে তা ঠেকানোর নিজস্ব আকাশ প্রতিরক্ষা থাকতে হবে। এর জন্য আধুনিক ড্রোন প্রযুক্তি, অ্যান্টি-মিসাইল ব্যবস্থা এবং সামরিক বাহিনীকে কৌশলগতভাবে যুগোপযোগী করা। নাগরিকের সুবিধা এখানে একটাই, সোজা: ঘুমের মধ্যে আকাশ অরক্ষিত থাকবে না।
স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি। জাতীয় স্বার্থ সবার ওপরে। ভারসাম্যপূর্ণ নীতি, যা কূটনৈতিক চাপ বা সামরিক হুমকির সামনে ঢাল হয়। কোনো শিবিরের ভাড়াটে হয়ে নাগরিকের বাজার, সীমান্ত বা সমুদ্র বেচবে না।
সংবিধান সংস্কার ও নিরপেক্ষ নির্বাচন। গণতন্ত্রের ভিত্তি সংবিধান। কর্তৃত্ববাদী চর্চা বন্ধ করতে সংবিধানের সময়োপযোগী সংস্কার। তার সঙ্গে পুরোপুরি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন। প্রশাসন দলের হাত থেকে আলাদা, যাতে ভোট ও জনমত খাঁটি থাকে। নাগরিকের সুবিধা: ভোটকেনা যাবে না, থানার দারোগা ভোটের দিন দলের কর্মী হবেন না, চাকরির ভাগ্য দলীয় তালিকায় ঝুলবে না।
বিকেন্দ্রীকরণ, রাস্তা ও জ্বালানি
শিল্পাঞ্চল ছড়িয়ে দিতে হবে। ঢাকার ওপর থেকে মানুষের চাপ কমাতে এলাকাভিত্তিক ও জেলাভিত্তিক শিল্পাঞ্চল। কাজ যে জেলায়, ঘরও সে জেলায়। রাজধানীতে এসে ভাড়া, জট ও বস্তি তিনটা একসঙ্গে কেনার দিন শেষ হওয়া উচিত।
ঢাকা–চট্টগ্রাম এখন একটা প্রধান মহাসড়কের ওপর দাঁড়িয়ে। সেই নির্ভরতা কমাতে বিকল্প রাস্তা। গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে ফ্লাইওভার। ঢাকার ভেতরে অল্প দূরত্বের পথে ট্রাফিক ব্যবস্থা শতভাগ কার্যকর ও আধুনিক করতে হবে। নাগরিকের সুবিধা সোজা হিসাব: স্কুল, হাসপাতাল ও অফিসে যাওয়া মানে দুই ঘণ্টা পুড়িয়ে ফেলা নয়। অ্যাম্বুলেন্স যেন বাসের লাইনে আটকে না মরে।
গ্যাস। ঢাকায় পাইপলাইনে যে অপচয় হচ্ছে, সেটা বন্ধ করতে হবে। বাসাবাড়িতে পাইপের বদলে পর্যায়ক্রমে সিলিন্ডার। এই খাতে দেশীয় ও বিদেশি বিনিয়োগ এবং সঠিক বাজেট। নাগরিক পাবেন মাপযোগ্য গ্যাস। যিনি পোড়ান না, তিনি পাইপের ফাঁকের বিল দেবেন না। কারখানা ও রান্নাঘর একই চুরির লাইনে বাঁধা থাকবে না।
হেফাজত থেকে পলাতক আসামি সুলতান, দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগনবায়নযোগ্য শক্তি। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের জন্য উন্নত টারবাইন, দেশজুড়ে সৌরবিদ্যুৎ, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ। আলো নিভে গেলে ইনভার্টারের বাজারে দেশ চলে না। নাগরিকের সুবিধা: হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটার, পরীক্ষার হল ও সেচের পাম্প যেন লোডশেডিংয়ের খাতায় না পড়ে।
পানি, হাসপাতাল ও কাজ
বিশুদ্ধ পানি। দেশের দক্ষিণাঞ্চল, বিশেষ করে চট্টগ্রামে, নিরাপদ পানির তীব্র সংকট। ভূগর্ভের পানি কাছে, কিন্তু পরিশোধন না থাকলে পানিবাহিত রোগ। উন্নত বিশ্বের মডেলে প্রতিটি এলাকায় আধুনিক ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট ও কেন্দ্রীয় সরবরাহ। সবার জন্য নিরাপদ পানি। এটা বিলাসিতা নয়। নাগরিকের প্রথম সুবিধা: কলের পানি ফুটিয়ে খেতে হবে না এই ভয়ে যে পেট খারাপ হবে। শিশু ডায়রিয়ায় যেন হাসপাতালের বারান্দায় না পড়ে।
স্বাস্থ্য। বর্তমান চিকিৎসাব্যবস্থার বড় ঝুঁকি চিহ্নিত করে আধুনিক করতে হবে। সরকারি হাসপাতালের সেবার মান বাড়বে। চিকিৎসকের জবাবদিহি থাকবে। নাগরিকের সুবিধা: টিকিট কেটে যেন ডাক্তার পাওয়া যায়, বেসরকারি ক্লিনিকের দালাল যেন জরুরি ওয়ার্ডের দরজায় না দাঁড়ায়, ওষুধের নাম যেন কমিশনের তালিকা না হয়।
বেকারত্ব। বিপুল জনসংখ্যাকে বোঝা না ভেবে আধুনিক কারিগরি প্রশিক্ষণে দক্ষ জনশক্তি করতে হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাকে সহজ শর্তে ঋণ, যাতে নতুন কাজের খাত খোলে। নাগরিকের সুবিধা: সনদ কাগজে থেকে যাবে না। হাতে যন্ত্র, মাথায় হিসাব, ব্যাংকে জামানতের জটে আটকে না থেকে ছোট কারখানা। প্রবাস যেন একমাত্র দরজা না হয়।
ধাপে ধাপে, টাকা কোথা থেকে
এই খসড়া এক দিনে হয় না। প্রথম ধাপ প্রশাসনিক। যানজট, ট্রাফিক ও গ্যাসের অপচয় কঠোর নির্দেশে দ্রুত কমানো যায়। নতুন সেতু না বানিয়েও সিগন্যাল, লেন ও চুরি বন্ধ করা যায়।
দ্বিতীয় ধাপ বিনিয়োগ। বিশুদ্ধ পানি, আধুনিক চিকিৎসা ও কারিগরি শিক্ষায় সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব এবং বিদেশি বিনিয়োগ। শর্ত একটা: চুক্তি প্রকাশ্য, মুনাফা যেন পানির দাম না হয়ে যায়।
অর্থনৈতিক ধাক্কায় দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে বাংলাদেশের ৬.২ কোটি মানুষতৃতীয় ধাপ বড় বাজেট। জাতীয় প্রতিরক্ষা, নিজস্ব ড্রোন, বিকল্প মহাসড়ক। এগুলো মহাপরিকল্পনায় পর্যায়ক্রমে। প্রতিটি খাতে শতভাগ স্বচ্ছতা, দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশ ও সঠিক নেতৃত্ব না থাকলে কাগজের রূপরেখা কাগজেই থাকে।
ডেভেলপ ফর বাংলাদেশ তখনই উন্নত রাষ্ট্র গড়ে, যখন নাগরিক রাতে নিরাপদ থাকেন, সকালে ভোটের মতো কাজের অধিকার পান, দুপুরে বিশুদ্ধ পানি পান এবং সন্ধ্যায় ঘরে ফেরার রাস্তা জটে মরে না। উন্নত জনশক্তি মানে ডিগ্রির স্তূপ নয়। যে মানুষ দেশকে চালাতে পারে, তাকে দেশ যেন আগে বাঁচতে দেয়।
সম্পাদকীয় ডেস্ক · ঢাকা · ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, বিকেল ৪টা ১৬ মিনিট ০০ সেকেন্ড



