নিজস্ব প্রতিবেদক | ৬ অক্টোবর, ২০২৬

সমাজের অদৃশ্য সত্য এবং চাপা পড়া ঘটনাগুলো মানুষের চোখের সামনে তুলে আনার ক্ষেত্রে সাংবাদিকরা পালন করেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। তারা সমাজের দর্পণ। অথচ সেই দর্পণ ভেঙে ফেলার এক বর্বরোচিত মহড়া দেখল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) ক্যাম্পাস। গতকাল (৫ অক্টোবর) রাতে রাবি ক্যাম্পাসে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে একদল সশস্ত্র তরুণের বর্বরোচিত হামলার শিকার হয়েছেন কর্মরত সাংবাদিকরা। অভিযোগের তীর বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের দিকে। এই ঘটনায় ক্যাম্পাসে তৈরি হয়েছে চরম আতঙ্ক এবং জনমনে জেগেছে নানা প্রশ্ন।

কী ঘটেছিল গতকাল রাতে?

ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত সাড়ে ৮টা। জিয়াউর রহমান হলের সামনে হঠাৎ করেই উত্তপ্ত হয়ে ওঠে ক্যাম্পাস। প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন মার্কেট থেকে মিছিল নিয়ে জিয়াউর রহমান হলের গেটে আসে ছাত্রদলের কয়েকজন নেতাকর্মী। তাদের হাতে ছিল বস্তাভর্তি দেশীয় অস্ত্র— রামদা, চাপাতি, পাইপ, হকিস্টিক ও বেসবল ব্যাট।

জানা যায়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি পোস্টের মন্তব্যকে কেন্দ্র করে আহসান হাবিব ও রাকিবুল নামের দুইজনের মধ্যে বিরোধের জেরে এই ঘটনার সূত্রপাত। তবে পরিস্থিতি ভয়ংকর রূপ নেয় যখন সাংবাদিকরা সেখানে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে যান। অস্ত্রহাতে অবস্থানের ভিডিও করতে গেলে দৈনিক সমকাল, আজকের পত্রিকা, বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম এবং দ্য ডেইলি স্টারের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধিদের ওপর বেধড়ক হামলা চালানো হয়। প্রক্টর সাংবাদিকদের হলের ভেতরে ঢুকিয়ে রক্ষা করার চেষ্টা করলেও হামলাকারীরা থামেনি। এই হামলায় চার সাংবাদিকসহ অন্তত ১৪ জন আহত হয়েছেন। পরিস্থিতি এতটাই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায় যে, প্রক্টরের ভাষ্যমতে— খবর পেয়ে পুলিশ এলেও তারাও ভয়ে পালিয়ে যায়!

আজকের দিনে ক্যাম্পাসে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা যেভাবে প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া দিয়ে তথাকথিত ‘সাহসিকতা’র পরিচয় দিচ্ছেন, তা দেশের সাধারণ জনগণ এবং সাংবাদিক মহলে একটি বড় ও যৌক্তিক প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সবার মনে আজ একটাই প্রশ্ন— সদ্য পতিত স্বৈরাচারী শেখ হাসিনা সরকারের গত ১৭ বছরের শাসনামলে তাদের এই অসীম সাহসিকতা কোথায় লুকিয়ে ছিল? যখন সাধারণ ছাত্র-জনতা স্বৈরাচারের যাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছিল, তখন কি এই পেশিশক্তি কেবল আত্মগোপনেই সীমাবদ্ধ ছিল? আর আজ যখন মুক্ত পরিবেশে সবার কথা বলার অধিকার নিশ্চিত হওয়ার কথা, তখন তারা সাংবাদিকদের ওপরই চড়াও হচ্ছে!

শহীদ উসমান হারির সেই অমোঘ সতর্কবাণী

সাংবাদিকদের ওপর এহেন নগ্ন হামলা আমাদের মনে করিয়ে দেয় শহীদ উসমান হারির সেই কালজয়ী বক্তব্য। তিনি ময়দান থেকে দৃপ্তকণ্ঠে হুশিয়ারি দিয়ে বলেছিলেন— “এরা দুই বছরও টিকতে পারবে না।”

আজকের এই নৈরাজ্য, অসহিষ্ণুতা এবং সমাজের সত্য উন্মোচনকারীদের ওপর ছাত্রদলের এমন আক্রমণাত্মক আচরণ দেখে মনে হচ্ছে, সময়টি হয়তো আরও ঘনিয়ে এসেছে। ক্ষমতার অন্ধ মোহে পড়ে যারা কলমকে অস্ত্র দিয়ে স্তব্ধ করতে চায়, তাদের পতন অনিবার্য। তবে কি শহীদ উসমান হারির সেই ভবিষ্যদ্বাণীই আজ অত্যন্ত যুক্তিযুক্তভাবে প্রমাণিত হতে চলেছে?

ঢাকা থেকে রংপুর অভিমুখে ১১ দলের লংমার্চ শুরু

যদিও রাবি ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহি জানিয়েছেন যে, বিষয়টি কেন্দ্রীয় কমিটিকে জানানো হয়েছে এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে; তবে এই প্রতিশ্রুতি সাধারণ শিক্ষার্থীদের মনে কতটা স্বস্তি ফেরাতে পারবে তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া, সাংবাদিকদের রক্তপাত এবং খোদ পুলিশের পিছু হটার এই ঘটনা গোটা দেশের শিক্ষাঙ্গনের নিরাপত্তার জন্য এক অশনিসংকেত। পেশিশক্তি দিয়ে সত্যের কণ্ঠরোধ করার এই অপচেষ্টা রুখে না দিলে, আগামীতে আরও বড় কোনো সংঘাতের সাক্ষী হতে হবে জাতিকে।

নিজস্ব প্রতিবেদক · রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় · ৬ অক্টোবর ২০২৬, বিকেল ৩টা ২৭ মিনিট।