চাপের হাসপাতাল

নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রোগী শোয়ান মেঝেতে, স্বজনরা দাঁড়িয়ে থাকেন করিডরে—আর অভিযোগ ওঠে, মিডিয়া বা উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ এলেই হাসপাতালের স্টাফদের আচরণ বদলে যায়। স্থানীয়রা প্রশ্ন তুলেছেন, উত্তরাঞ্চলের এই ৫০ শয্যার সরকারি হাসপাতালে রোগীর জীবন নিয়ে ছিনিমিনি খেলা হলে দায় নেবে কে?

হাসপাতালটি শুধু দুর্গাপুরের প্রায় আড়াই লাখ মানুষের ভরসা নয়। পাশের কলমাকান্দা ও ধোবাউড়া থেকেও প্রতিদিন রোগী আসেন। শয্যা ৫০ হলেও ভর্তি চাপ প্রায়ই তার চেয়ে বেশি। জরুরি ও বহির্বিভাগে দিনে কয়েকশ মানুষের ভিড়। সেই চাপের মধ্যেই নতুন অভিযোগ জমা পড়ছে রিভার্স নিউজের মেসেঞ্জারে।

কী অভিযোগ উঠেছে

অভিযোগকারীদের দাবি, শ্বাসকষ্ট, গাইনি ও বয়স্ক রোগীরা ওয়ার্ড থেকে হেঁটে দোতলার ইমার্জেন্সি নার্স রুমে যেতে পারেন না। তবু তাঁদের বলা হয় সেখানে গিয়ে সেলাইন ধরতে। নারী ওয়ার্ডে দায়িত্বপ্রাপ্ত নার্সদের আচরণ সাধারণ মানুষ ও অসহায় রোগীদের সঙ্গে কর্কশ এবং অশালীন—এমন দীর্ঘদিনের অভিযোগ আরও তীব্র। কেউ কেউ বলছেন, সুযোগ পেলেই হাসি-খেলা, অথচ রোগীর কষ্ট দেখার মানুষ নেই।

আরও একটি অভিযোগ ঘুরছে মুখে মুখে—সরকারি ওয়ার্ডে যে ব্যবহার, প্রাইভেট চেম্বারে তা থাকে না। চিকিৎসক রায়হান স্যারকে ঘিরে পোস্টের পর কিছু উন্নতির কথাও শোনা যায়। কিন্তু অভিযোগকারীরা বলেন, সরকারি ডিউটি সময়ে সব রোগী সমানভাবে দেখা হয় না। আগে ভিডিও প্রকাশের পর তাঁকে বদলির আদেশ এসেছিল বলেও দাবি করা হয়েছে; পরে সেটি আটকে যায়। কিছু মহল অভিযোগ করেছেন, পরবর্তীতে অর্থের বিনিময়ে খবর না ছাড়ার চাপ দেওয়া হয়েছে। এসব দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বা সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের দাপ্তরিক জবাব পাওয়া যায়নি।

মাননীয় ডেপুটি স্পিকারকে ঘিরে দাবি

সবচেয়ে সংবেদনশীল অভিযোগটি নারী ওয়ার্ডের বর্তমান দায়িত্বপ্রাপ্ত নার্স প্রধান বা দায়িত্বশীল নারী কর্মকর্তাকে ঘিরে। অভিযোগকারীদের বরাত দিয়ে জানা গেছে, তিনি দাবি করেছেন—নেত্রকোনা-১ (দুর্গাপুর-কলমাকান্দা) আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল মহোদয়ের সঙ্গে তাঁর বৈঠক হয়েছে। দোতলা পরিদর্শনের অনুরোধ করা হলে মাননীয় ডেপুটি স্পিকার নাকি বলেছেন, “আমাকে লজ্জা দেবেন না, এভাবে চালিয়ে যান।”

এই উক্তি সরাসরি নিশ্চিত করা যায়নি। ডেপুটি স্পিকারের দপ্তর থেকেও কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবু মাঠপর্যায়ে প্রশ্ন উঠেছে—এলাকার সবচেয়ে প্রভাবশালী জনপ্রতিনিধি নিজে পরিদর্শন করেন বলে পরিচিত হলে, অভিযোগের জবাবদিহি কোথায়?

দায় কার

জানুয়ারি ২০২৬-এ এই কমপ্লেক্সে অনিয়মের অভিযোগে দুদকের পরিদর্শন হয়েছিল বলে স্থানীয়ভাবে খবর ছড়িয়েছিল। তার পরও রোগী ও স্বজনদের অভিযোগ থামেনি। জনগণের দাবি এখন সোজা—

- খারাপ ব্যবহারে প্রমাণিতদের বদলি বা শাস্তি - শয্যা ও জনবল বাড়ানো - ওয়ার্ড, সেলাইন, খাবার ও টয়লেটের স্বচ্ছ নজরদারি - সরকারি ডিউটি ও প্রাইভেট প্র্যাকটিসের সীমারেখা মেনে চলা

একটি সরকারি হাসপাতাল করদাতার টাকায় চলে। নার্স-চিকিৎসক সেবক—এ কথা শুধু বক্তৃতায় থাকলে চলবে না। চাপ যতই থাকুক, রোগীকে অবজ্ঞা করার অধিকার কারও নেই।

রিভার্স নিউজ শুধু জনগণের না-বলা কথা তুলে ধরছে। তদন্তের দায়িত্ব প্রশাসন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও জনপ্রতিনিধির। দুর্গাপুর-কলমাকান্দা-ধোবাউড়ার মানুষ একটাই চায়—সরকারি হাসপাতালেও যেন মানুষের মতো ব্যবহার মেলে।

সতর্কতা

এই প্রতিবেদনের অভিযোগগুলো এলাকাবাসী ও অভিযোগকারীদের দাবি অনুযায়ী তুলে ধরা হয়েছে। সরেজমিনে প্রতিটি দাবি স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত অভিযোগ প্রমাণিত নয়। সংশ্লিষ্টদের জবাব পাওয়া গেলে তা প্রকাশ করা হবে।

রিভার্স নিউজ ডেস্ক · দুর্গাপুর প্রতিনিধি · ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬